Home 1stpage সংকট সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে, শিক্ষকদেরও ভরসা এখন গাইড বই

সংকট সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে, শিক্ষকদেরও ভরসা এখন গাইড বই

71
0

imagesস্টুডেন্ট কর্ণার: ফাঁকিবাজ শিক্ষার্থীরা এতদিন গাইড বইনির্ভর থাকলেও এখন তা খোদ শিক্ষকেরই শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের পড়ানোর সম্যক জ্ঞান না থাকায় প্রতিদিন তারা নিষিদ্ধ (!) গাইড বইয়ের দু-চার পাতা পড়ে ক্লাসে গিয়ে সে মুখস্তবিদ্যা আওড়াচ্ছেন। এমনকি স্কুলপরীক্ষার প্রশ্ন করতেও তারা গাইড বইয়ের সহযোগিতা নিচ্ছেন। এতে প্রাথমিক থেকে সর্বস্তরের শিক্ষামানে ব্যাপক ধস নেমেছে। বিশেষ করে যে লক্ষ্যে পাঠ্যপুস্তকে সৃজনশীল পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল তার পুরোটাই ভেস্তে যেতে বসেছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা জানান, শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়াই সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়েই বিপাকে পড়েছেন। তাই বাধ্য হয়েই তাদের গাইড বইয়ের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে।

‘দেশের সব শিক্ষক সৃজনশীল পদ্ধতিতে পড়ানোর প্রশিক্ষণ পেয়েছেন এবং তারা তা ভালোভাবে রপ্ত করেছেন, সে অনুযায়ী তারা ভালোভাবেই শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন’_ শিক্ষা প্রশাসনের এমন দাবিও ভিত্তিহীন-উদ্ভট বলে খোদ শিক্ষকরাই নিঃসংকোচে স্বীকার করেন।

ঢাকার দুটি নামিদামি স্কুলের বেশ কজন শিক্ষক জানান, সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা হলেও অধিকাংশ বই সৃজনশীল ধারায় লেখা হয়নি। তাই আগের পরীক্ষা পদ্ধতি অনুযায়ী লিখিত বই পড়েই শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, বইয়ে যদি পর্যাপ্ত সংখ্যক নমুনা প্রশ্ন দেয়া থাকত তাহলে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা বই পড়ে কিছুটা ধারণা পেতে পারতেন। কিন্তু সে সুযোগ নেই। শিক্ষকদেরও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি। ফলে শিক্ষকরা গাইডবই পড়ে নিজেদের মতো করে ক্লাসে যতটুকু সম্ভব ধারণা দিচ্ছেন। আর এতটুকুই সম্বল শিক্ষার্থীদের।

এদিকে সৃজনশীল পদ্ধতি আয়ত্তে আনতে না পারায় বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায়ও গাইডবই থেকে প্রশ্ন করার কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন রাজধানীর একাধিক স্কুলশিক্ষক। গাইড বই দেখে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতায় মার্ক দেয়ার কথাও মেনে নেন তারা।

অথচ স্কুল-কলেজের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায়ও গাইড বই থেকে প্রশ্ন না করার ব্যাপারে দুই দফায় সরকারি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। ওই নির্দেশনা উপেক্ষা করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের এমপিও (বেতনের সরকারি অংশ) বাতিল করার কথাও বলা হয়েছে। বাইরে থেকে প্রশ্ন না কেনার ব্যাপারেও নির্দেশনা আছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের।

খোদ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) জরিপেই এ নির্দেশনা না মানার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, মোট শিক্ষকের ৩৭ শতাংশই সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্ন করার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি। অবশ্য শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের ধারণা প্রকৃত সংখ্যা এর প্রায় দ্বিগুণ।

এদিকে রাজধানীর নামিদামি স্কুলের প্রধানরা তাদের শিক্ষকদের গাইড পড়া এবং তা দেখে প্রশ্ন করার অভিযোগ অস্বীকার করলেও প্রকৃতচিত্র একেবারেই ভিন্ন। ভিকারুননিসা-নূন, মতিঝিল আইডিয়াল ও হলিক্রসসহ ঢাকার খ্যাতনামা বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বাসা-কোচিং সেন্টার ঘুরে দেখা গেছে, তাদের সবার কাছে প্রায় প্রতিটি বিষয়ভিত্তিক গাইড বই রয়েছে। সেখান থেকে তারা নোট তৈরি করে কোচিং ও প্রাইভেটের শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন।

পাঠ্যবইয়ের ঘোরপ্যাঁচের সৃজনশীল প্রশ্ন বুঝতে না পেরে তারা গাইড বই আউড়ে তা-ই শিক্ষার্থীদের মুখস্ত করাচ্ছেন বলে স্বীকারও করেন তারা।

অথচ সৃজনশীল পদ্ধতিতে বইয়ের পাঠসংশ্লিষ্ট উদ্দীপক পড়ে পাঠ্যবই ও বাইরের অর্জিত জ্ঞানের আলোয় শিক্ষকদের তা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার কথা। মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে গাইড বই ও কোচিংয়ের সাহায্য ছাড়াই শিক্ষার্থীদের প্রতিভা, মেধা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে সৃজনশীল মনন গড়ে তোলাই সৃজনশীল পদ্ধতির লক্ষ্য।

এদিকে শিক্ষকরা এ পরিস্থিতির জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ সঙ্কটকে দায়ী করলেও শিক্ষা বিশারদরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের ভাষ্য, ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহর, এমনকি গ্রামাঞ্চলেরও অধিকাংশ শিক্ষক তাদের প্রকৃত দায়িত্ব থেকে সরে এসেছেন। তারা নিজেদের এখন টাকা কামানোর মেশিন হিসেবে তৈরি করেছেন। সিংহভাগ শিক্ষকই প্রাইভেট টিউশন ও কোচিং বাণিজ্য মেতেছেন। তাই তারা গাইডবই পড়ে বেশি ছাত্র পড়ানোর ‘শর্টকাট’ রাস্তা ধরেছেন। পাঠ্যবই ভালোভাবে পড়লে গাইড বইয়ের সাহায্য ছাড়াই সব প্রশ্নের উত্তর করা সম্ভব বলে মনে করেন শিক্ষা বিশারদরা।

অন্যদিকে হযবরল এ শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের অদক্ষতা-অযোগ্যতা ও নিয়ন্ত্রণহীনতাকেও দায়ী করেন অনেকেই। তাদের ভাষ্য, শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য থেকে ফেরানোর পাশাপাশি বাজার থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত গাইড বই পুরোপুরি তুলে দেয়া হলে শিক্ষাঙ্গনে আগের অবস্থা ফিরবে। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই নিজের মানোন্নয়নে সচেষ্ট হবেন।

সৃজনশীল পদ্ধতির নামে সর্বস্তরের শিক্ষার্থীর পাশাপাশি খোদ শিক্ষকরাও গাইডবই নির্ভর হয়ে ওঠার এ বিষয়টিকে ‘গভীর ষড়যন্ত্র’ বলেও আখ্যায়িত করেন অভিভাবক প্রতিনিধিরা। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তারা বলেন, সরকার চার-পাঁচশ টাকার পাঠ্যপুস্তক ফ্রি দিয়ে তাদের সন্তানদের দেড়-দুই হাজার টাকার গাইড বই কিনতে বাধ্য করছে। এর ওপর কোচিং এখন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সৃজনশীল বিষয় নিয়ে অভিজ্ঞতা জানতে চাওয়ায় ভিকারুননিসা নূন স্কুলের অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সুজাউর রহমান শুভ্র প্রচ- ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কিসের সৃজনশীল? ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বিভ্রান্ত এবং তাদের মাথা নষ্ট করার ব্যবস্থা। সেই সঙ্গে অভিভাবকদেরও পাগল করার পরিকল্পনা।’

তিনি জানান, প্রতিদিন দু’আড়াই ঘণ্টা সময় নষ্ট করেও তিনি তার সন্তানকে আশানুরূপভাবে পড়াতে পারছেন না। নিজেও অনেক সৃজনশীল প্রশ্ন ঠিকমতো বুঝতে না পারার কথাও স্বীকার করেন হতাশ ওই অভিভাবক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যায়যায়দিনকে বলেন, সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে নতুন কিছু বের করা। যেখানে জানা ও বোঝার পাশাপাশি প্রায়োগিক জ্ঞান প্রয়োজন। কিন্তু সৃজনশীলতার নামে যে পদ্ধতিতে শিক্ষা প্রণয়ন করা হয়েছে, তা এর মূল অর্থের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। এখানে এক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন করা হচ্ছে, কিন্ত উত্তর চাওয়া হচ্ছে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। ফলে সৃজনশীলতার মূল অর্থ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি আরো বলেন, প্রশ্নে যেটা আপাতদৃষ্টিতে নেই- সেটা খুঁজে বের করাই সৃজনশীলতা। বিষয়টা যেখানে শিক্ষকরাই বোঝেন না, যেখানে ছাত্রদের অবস্থান তো অনেক দূরে। অধ্যাপক জিন্নাহ বলেন, সৃজনশীল শব্দটা ভালো। এর নামে যা ফুটিয়ে তোলা দরকার, শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রশ্ন পদ্ধতিতে তা ফুটছে না। ফলে শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা হেনস্থার শিকার হচ্ছেন।

সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির উদাহরণ টেনে ঢাবির এই অধ্যাপক বলেন, প্রশ্নপত্রে দেখা যায়, পলাশী যুদ্ধের ওপর তিন লাইনের বর্ণনা তুলে ধরে এ যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল লিখতে বলা হয়েছে। ফলে ঘুরে-ফিরে শিক্ষার্থীরা সেই গাইড বইয়ের কাছেই ফেরত যাচ্ছে। সৃজনশীলতার প্রকৃত বিষয় ধরতে না পারলে এ ব্যবস্থা ছাত্রছাত্রীদের কোনো উপকারে আসবে না মত দেন তিনি।

ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক শাহ্ শামীম আহ্মেদ বলেন, সৃজনশীল পদ্ধতি প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু এর নামে যা চলছে_ তা শিক্ষার্থীদের কল্যাণ বয়ে আনা তো দূরের কথা, তাদের আরো ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সৃজনশীলতার জন্য ট্রেনিং প্রয়োজন। চিন্তা করে নতুন কিছু বের করার যে দক্ষতা, সেটা তো আগে শিক্ষকদের বুঝতে হবে। কিন্তু প্রকৃত ট্রেনিং ছাড়াই এ পদ্ধতি চালু করায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ে বিপাকে পড়েছে। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই সবাইকে এখন গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে।

এদিকে উচ্চ আদালতের নির্দেশে গাইড বই মুদ্রণ-প্রকাশনা ও বেচাকেনা নিষিদ্ধ হলেও রহস্যজনক কারণে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এ ব্যাপারে নীরব ভূমিকা পালন করছে বলেও বিভিন্ন মহলের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। বইয়ের হাট বাংলাবাজারসহ বিভিন্ন লাইব্রেরি ঘুরে যার চাক্ষুস প্রমাণও পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, প্রতিটি পুস্তকের দোকানেই প্রাথমিক থেকে সর্বস্তরের গাইড বই থরে থরে সাজানো রয়েছে।

অথচ প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকের নোট বই মুদ্রণ, প্রকাশনা, আমদানি, বিতরণ ও বিক্রি নিষিদ্ধকরণের উদ্দেশ্যে প্রণীত ১৯৮০ সালের নোট বই নিষিদ্ধকরণ আইনের ৩ নাম্বার ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি নোট বই মুদ্রণ, প্রকাশনা, আমদানি, বিক্রয়, বিতরণ অথবা কোনো প্রকারে উহার প্রচার করিতে বা মুদ্রণ, প্রকাশনা, বিক্রয়, বিতরণ কিংবা প্রচারের উদ্দেশ্যে রাখিতে পারিবেন না।’ এ আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ সাত বছরের সশ্রম কারাদ- অথবা ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত করার বিধান রাখা হয়েছে। পরে একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নোট বই নিষিদ্ধকরণ আইনের আওতায় নোট বইয়ের সঙ্গে গাইড বইও বাজারজাত ও বিক্রি নিষিদ্ধ করেন হাইকোর্ট।

তবে প্রকাশকরা এখন নতুন ফন্দি এঁটে নোট বই ও গাইড বইয়ের নাম পাল্টে সৃজনশীল সহায়ক বই নামকরণ করে তা নির্বিঘ্নে বাজারজাত করছেন। আর এ সুযোগ পুঁজি করে শিক্ষকরাও তা নির্দ্বিধায় হাতে তুলে নিয়েছেন। যা জেনেশুনে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন মেনে নিয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here